কুমিল্লায় সম্পত্তির লোভে শ্বাশুড়ীকে হত্যা করল ঘরজামাই!


কুমিল্লার বার্তা ডেস্ক ● কুমিল্লায় সম্পত্তির লোভে সিঁদকেটে ঘরে ঢুকে সৎ শ্বাশুড়ীকে বালিশ চাপায় শ্বাসরোধ করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে পাষন্ড ঘরজামাই। এ লোহর্ষক ঘটনাটি ঘটে দেবিদ্বার উপজেলার ধামতী গ্রামে।

হতভাগ্য সৎ শ্বাশুড়ীর নাম ফরিদা বেগম (৬২)। তিনি উপজেলার ধামতি পূর্বপাড়া খোশকান্দি গ্রামের মৃত নুরুলল ইসলামের স্ত্রী। আর ঘাতক পাষন্ড ঘরজামাই মনির হোসেন (৩৫) ভিকটিমের সৎ মেয়ে আয়েশার স্বামী।

ফরিদা বেগমের বসত ঘরের পাশেই ঘরজামাই মনির শ্বশুরের দেয়া জায়গায় আলাদা একটি ঘর তুলে স্ত্রী সন্তান সহ বসবাস করে আসছিল। কখনো রাজমিস্ত্রীর কাজ আর কখনো অটো চালিয়ে সংসার চালাত সে। তার মূলবাড়ী দেবিদ্বার উপজেলার খয়রাবাদ গ্রামে হলেও বর্তমানে ওখানে তাদের কোন সহায় সম্পত্তি নাই। শ্বসুরের ঠিকানাতেই থাকত সে।

বুধবার বিকেল ৫টায় কুমিল্লা ৪নং আমলী আদালতে অভিযুক্ত ঘরজামাই মনির হোসেনকে হাজির করলে, মনির হত্যার কারন ও হত্যাকান্ড সংগঠনের বর্ননা প্রদান করেন। দায়িত্বরত ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ইরফানুল হক চৌধূরী উক্ত জবানবন্দী ১৬৪ ধারায় রেকর্ড পূর্ব তাকে জেল হাজতে প্রেঢনের নির্দেশ দেন।

পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী শ্বাশুড়ীর ভিটে দখলের পায়তারায় সোমবার (৮ অক্টোবর) রাত ২টায় মনির হোসেন শ্বাশুরীর টিন সেট ও কাঁচা ভীটি ঘরের জানালার নিচের অংশে সিঁদকেটে সিঁদকাটার অংশ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে জানালা খুলে ঘরে ঢুকে এবং বৈদ্যুতিক বাতি নিভিয়ে শ্বাশুড়ীর বুকের উপর বসে ঠান্ডা মাথায় বালিশ চাপায় শ্বাস রুদ্ধ করে হত্যা করে।

অতঃপর ঘরে কোথাও টাকা পয়শা আছে কিনা খুঁজে না পেয়ে শ্বাশুড়ীর মোবাইল সেটটি নিয়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দিয়ে সিঁদকাটায় ব্যবহৃত কোদাল নিজ ঘরে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে সেও অন্যদের সাথে স্বাভাবিকভাবে মৃত: শ্বাশুড়ীর জন্য কান্নাকাটি করতে থাকে কিন্তু তার স্বাভাবিক কান্নাকাটির আড়ালে কিছুটা অস্বাভাবিকতা খুঁজে পান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মিজানুর রহমান। প্রাথমিক ভাবে তাকে কিছু প্রশ্ন করা হলে সে স্বাভাবিক জবাব দিলেও পুলিশ সন্দেহ এড়াতে পারেনি। তাকে নিয়ে আসা হয় থানায়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

স্থানীয়রা জানান, ওই গৃহবধূ সকাল ৬/৭টায় পর্যন্ত ঘরের দরজা না খোলায়, প্রতিবেশীরা তাকে ডাকা-ডাকি করেও কোন সাড়া পাননি। পরে জানালা দিয়ে চকির একপাশে চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন এবং ঘরের দরজা ভেঙ্গে প্রবেশ করে তাকে মৃত: অবস্থায় দেখতে পান। এসময় ঘরের জানালার নিচের অংশে সিঁদকাটা দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়।

সংবাদ পেয়ে দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচর্জি মোঃ মিজানুর রহমান ও উপ-পরিদর্শক (এস,আই) প্রেমধন মজুমদারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে যান এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে ঘরজামাই মনির হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসেন এবং ঘটনাটি সহস্যাবৃত্তি হওয়ায় পুলিশ গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার পূর্বক ময়না তদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেঢ়ন করেন।

পুলিশ ছোরত হাল রিপোর্ট তৈরীর সময় নিহতার শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন পাননি, স্থানীয়দের তথ্যমতে গৃহবধূর কোন শত্রু ছিলনা, অর্থ সম্পদও ছিলনা, তবে সে ৫/৬বছর যাবত শ্বাস কষ্ট রোগে ভোগছিল, তাই পরিবারের সৎ জামাইসহ অনেকেরই তার মরদেহ ময়না তদন্তে আপত্তি ছিল।

অনেকেরই সন্দেহ ছিল, চোর সিঁদ কেটে ঘরে ঢোকায় ভয়ে হয়তো হার্ট এটাকে মারা গেছেন তিনি। তার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন, তার গর্বের ৫কণ্যা এবং স্বামীর পূর্বের সংসারের আরো ২কণ্যা রয়েছে। ছোট কণ্যা ছাড়া সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট কণ্যা কুমিল্লা ইপিজেটে গার্মেন্টসে কর্মরত আছেন। মেয়েদের সাহায্য সহায়তায় তার সংসার চলে আসছিল।

সম্পদ বলতে মেয়েদের পক্ষ থেকে মায়ের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য একটি মোবাইল সেট ছিল, আগের সংসারের বড়মেয়ের স্বামীকে ঘরজামাই হিসেবে দেয়া সম্পত্তির বাহিরে আর মাত্র ৬ শতাংশ জমিও ছিল। তবে স্থানীয়দের দাবী ছিল কেউ না কেউ তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করার। কিন্তু পুলিশ হত্যা করার দৃশ্যমান কোন চিহ্ন না পাওয়ায় এবং ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ অবস্থায় তার মেয়েদের দেয়া মোবাইল সেটটি না পাওয়া সর্বপরি সিঁদকাটার অংশ দিয়ে কোন চোর ঢুকতে না পারার সন্দেহে লাশ ময়না তদন্তের সিদ্ধান্ত নেন।

পুলিশ ভিক্টিমের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতে থাকেন। হত্যাকান্ডের ১২ঘন্টার মধ্যেই পুলিশ হত্যার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে আটক পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে ঘরজামাই মনির হোসেন(৩৫)কে ব্যপক জিজ্ঞাসাবাদে বেড়িয়ে আসে হত্যাকান্ডের রহস্য ও মূলহোতার পরিচয়।

পুলিশ মনিরের স্বীকারোক্তিমতে বুধবার সকালে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত আলামত হিসেবে বালিশ ও মাটি কাটার কোদাল জব্ধ করেছে। ওই ঘটনায় নিহতার কণ্যা মরিয়ম বাদী হয়ে মনির হোসেনকে একমাত্র আসামী করে দেবিদ্বার থানার ৪৫৯/৩৮০/৩০২/৩৪ ধারায় মঙ্গলবার (৯আগষ্ট) রাতেই মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-৫।

দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মিজানুর রহমান জানান, জিজ্ঞাসাবাদে সৎ মেয়ে আয়েশার জামাই মনির হোসেন জানায় সে সৎ শ্বাশুড়ীকে সহ্য করতে পারতনা। তাই প্রায়ই ঝগড়া ও মানষিক অত্যাচার করত শ্বাশুড়ীকে। শ্বাশুড়ী অসুস্থ্য হওয়ায় সৎ মেয়ের জামাইকে দেয়া অংশ ছাড়া বাকী ৬ শতাংশ জমি পূর্বের সংসারের ১ মেয়ে সহ ৬ মেয়েকে সমহারে ১ শতাংশ করে ৬শতাংশ জমি লিখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ওই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ছিল ঘরজামাই মনির হোসেন। ২০ হাজার টাকা নিয়েও তাকে খারাপ ডোবা জায়গায় থাকতে দেয়া এবং সবসময় ঘরজামাই, খারাপ বলে খোটা দিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করায় প্রতিশোধপরায়নে ক্ষুব্ধ হয়ে শ্বাশুড়ীর ঘরটি দখলে নেয়ার উদ্দেশ্যে ঠান্ডা মাথায় বালিশ চাপা দিয়ে একাই শ্বাশুড়ী ফরিদাকে হত্যা করেছে মর্মে অকপটে স্বীকার করে। তার স্বীকারোক্তি অনুসারে পুলিশ আজ সকালে কোদাল ও বালিশ জব্দ করেছে। সপ্তাহখানেক আগে পরিকল্পনানুযায়ী ৮অক্টোবর দিবাগত রাতে ওই হত্যাকান্ড সংঘটিত করে।


From comillarbarta.com

Source link

     More News Of This Category